Skip to main content

রবীন্দ্রনাথ ও কবিগান..

                Kabigaan and Rabindranath 


                                   কবিগুরুর চোখে কবিগান 




কবিয়াল গণেশ ভট্টাচার্য



সেথা আমি কি গাহিব গান?
যেথা কোকিল কুজনে মুখরিত
                           চিরবসন্ত বিরাজমান,
যেথা নিত্য নব ভাবে শত অভিনয়
                           নব নব অভিযান,
যেথা রবিকরতেজে উছলিত সদা
                          আঁধারের অবসান৷
সেথা আমি কি গাহিব গান? 


            বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে এই কবিগান শুনিয়েছিলেন মুর্শিদাবাদের প্রখ্যাত কিংবদন্তী কবিয়াল শেখ গুমানি দেওয়ান৷ ভোলা ময়রা পরবর্তীযুগে গুমানি সাহেবই ছিলেন পশ্চিমবঙ্গীয় কবিগানের ধারার সর্বশ্রেষ্ঠ কবিয়াল৷ কবিগুরুকে কবিগান শোনানোর সৌভাগ্য একবার তাঁর হয়েছিল এবং সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে কাব্যজগতের মহীরুহের সম্মুখে তিনি উচ্চকণ্ঠে গেয়েছিলেন— 


যাঁর গম্ভীর ওঁকারে হুঙ্কার শুনি
                             কাঁপয়ে মেদিনী প্রাণ,
যাঁর স্নিগ্ধ ঝংকারে সুললিত স্বরে
                             পশুপাখি ধরে তান,
সেই কবীন্দ্র রবীন্দ্র ভারতের চন্দ্র
                             স্বয়ং যেথায় অধিষ্ঠান,
সেথা আমি কি গাহিব গান?
যাঁর মধুর কবিত্বে বিমুগ্ধ ধরণী স্তব্ধ জগৎখান,
এশিয়া ইউরোপ ফ্রান্স আমেরিকা
                             রাশিয়া চীন জাপান৷
সেথা আমি কি গাহিব গান? 


              চারণকবি গুমানি দেওয়ান কর্তৃক গীত উপর্যুক্ত শব্দালঙ্কারেই অনুমেয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেন বিশ্বকবি৷ শুধুমাত্র কবিতা বা সাহিত্য জগতেই নয়, কবিগান সমাজেও কবিয়ালগণের নিকট কবিগুরু আজও চির উচ্চাসনে আসীন এবং বিষয়ভিত্তিক যুক্তিতর্কের অংশবিশেষেও তিনি সমুজ্জ্বল৷  

                                 কবিগুরুর মূল্যায়ন  


             কিন্তু কবিগান নিয়ে রবীন্দ্রনাথ খুব বেশী কালি কলম ব্যবহার করেন নাই৷ ১৩০২ বঙ্গাব্দে "সাধনা" পত্রিকায় তিনি কবিগানকে "নষ্টপরমায়ু" নামে অভিহিত করেছিলেন৷ তাঁর "লোকসাহিত্য" গ্রন্থের "কবিসংগীত" প্রবন্ধে কবিগান বিষয়ে এরূপ সমালোচনা উল্লিখিত আছে৷ তবে 'কবিগান' সম্পর্কে রবিঠাকুরের যে উচ্চধারণা ছিল না তা সন্দেহাতীত৷ তিনি হয়তো কদাচিৎ যে কবিগান শুনেছেন বা দেখেছেন সেটি ছিল 'খেউড়' তুল্য অশ্লীল৷ জনমনের কথা ব্যতিরেকে অর্থ প্রাচুর্যে মদমত্ত বণিক শ্রেণীর বিলাসী মনকে আনন্দ দিতে কদর্য ভাব ও ভাষার আশ্রয় নিয়েছিলেন তৎকালীন সিংহভাগ কবিয়ালগণ৷ কবিগানের ভাব ও ভাষার প্রতি কটাক্ষ করে রবীন্দ্রনাথ বলেন— "কবির দলের গানে অনেক স্থলে অনুপ্রাস, ভাব, ভাষা এমনকি ব্যাকরণকে ঠেলিয়া ফেলিয়া শ্রোতাদের নিকট প্রগলভতা প্রকাশ করিতে অগ্রসর হয়৷ অথচ তাহার যথার্থ কোন নৈপুণ্য নাই, কারণ তাহাতে ছন্দোবদ্ধ অথবা কোনও নিয়ম রক্ষা করিয়াই চলিতে হয় না৷" আচার্য দীনেশচন্দ্র সেন রবীন্দ্রনাথের এই কটাক্ষ মেনে না নিয়ে তাঁর সমালোচনার উত্তরে বলেন— "ভারতচন্দ্রের পর যখন রাজসভার পণ্ডিতবর্গের প্রশংসার গণ্ডি ছাড়াইয়া বঙ্গভাষা জনসাধারণের দুয়ারে উপস্থিত হইল তখন সংস্কৃতের তোড়জোড় ও আসবাব তাহাকে কতকটা ছাড়িয়া আসিতে হইল৷ কিন্তু ইতিমধ্যেই অনেক সংস্কৃত শব্দ বঙ্গভাষায় ঢুকিয়া পড়িয়াছিল, সুতরাং জনসাধারণের ভাষা তখন ময়নামতির গানের ভাষার মত একেবারে পাড়াগেঁয়ে রকমের ছিল না৷" কবিয়ালদের অনুপ্রাস সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন— "সংগীত যখন বর্বর অবস্থায় থাকে তখন তাহাতে রাগরাগিণীর যতই অভাব থাক তাল প্রয়োগের খচমচ কোলাহল যথেষ্ট থাকে৷ সুরের অপেক্ষা সেই ঘনঘন সশব্দ আঘাতে অশিক্ষিত চিত্ত সহজে মাতিয়া উঠে৷ একশ্রেণীর কবিতার অনুপ্রাস সেইরূপ ক্ষণিক ত্বরিত সহজ উত্তেজনার ফল৷ সাধারণ লোকের কর্ণ এত শীঘ্র আকর্ষণ করিবার এমন সুলভ উপায় আর নাই৷" রবীন্দ্রনাথের এই মন্তব্যের প্রতিবাদ করে আচার্য দীনেশচন্দ্র সেন বলেন— "এই শ্রেণীর লেখকদের ভাষা আলোচনা করিলে এই অনুপ্রাসের রীতি সম্বন্ধে অনেক কথা পরিস্কার হইবে৷ আমি একথা বলিতেছি না যে সর্বত্রই অনুপ্রাসগুলি উচ্চাঙ্গের কবিত্ব সূচক হইয়াছে, কিন্তু বহুস্থানে যে ভাষার শ্রীবৃদ্ধি করিয়াছে তাহাতে সন্দেহ নাই৷ অনেকস্থলে সেগুলি এরূপ সহজভাবে আসিয়াছে যে কবি সেগুলি কোনও চেষ্টা করিয়া আনেন নাই, তাহা অনুপ্রাস বলিয়া চোখে ঠেকিবে না অথচ সেগুলি ভাষার লালিত্য বাড়াইয়া দিয়াছে৷" 

             তবে কবিগানের নিন্দা করলেও কবিয়ালদের জন্ম, কর্ম ও শিক্ষার প্রতিকূল পরিবেশের কথা রবীন্দ্রনাথ স্মরণ করেছেন, এক্ষেত্রে প্রকাশ পেয়েছে তাঁর সহমর্মিতা৷ তিনি বলেছেন— "আমি যদি পল্লী কৃষকের ঘরে জন্মাতাম, কিম্বা মাঝি, মালো, কর্মকার বা তন্তুবায়ের ঘরে, আর আমার যদি থাকত সহজাত কবিত্বশক্তি তাহলে আমি বড়জোর একটা কীর্তনের বা পাঁচালীর দল খুলতাম অথবা কবিয়ালরূপে গ্রামে গ্রামে গাওনা গেয়ে বেড়াতাম৷ সমাজের প্রতিকূল পরিবেশেই প্রতিহত হত আমার এর চেয়ে বেশী কিছু হওয়ার সম্ভাবনা৷ আমি জানি অনেক সম্ভাবনীয়তার কুঁড়িই এভাবে অকালে ঝরে যায় যেগুলি ফুল হতে পারে না এবং দেখেছিও তেমন দু'দশজন৷" 



             যাইহোক, কবিসম্রাটের কবিগান বিষয়ক সমালোচনা অনেক পণ্ডিত গবেষকগণ নতমস্তকে স্বীকার করেন নাই৷ তবে একথা ঠিক যে, কবিগান যদি শুধু মনোরঞ্জন করতো এবং মনোরঞ্জনের জন্য কুপথে পা বাড়াতে দ্বিধা না করতো তাহলে কবিগানের অস্তিত্ব আজ আর খুঁজে পাওয়া যেত না৷ রবীন্দ্রনাথকে মাথায় রেখেই বলতে দ্বিধা নেই তাঁর মন্তব্য করা "নষ্টপরমায়ু" কবিগান আজও হেলেদুলে গ্রামবাংলার মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে এবং তাদের প্রতিবাদের ভাষা হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে৷ বিশ্বকবির শংসাপত্র না পেলেও কবিয়ালদের বিন্দুমাত্র ক্ষতিবৃদ্ধি হয় নাই৷ গ্রামগঞ্জের বিশাল জনমানসে এদের অস্তিত্ব ও জনপ্রিয়তা আজও সর্বোপরি উজ্জ্বল৷
           
                                           
তথ্য ঋণগ্রহণঃ
"বঙ্গভাষা ও সাহিত্য".. ডঃ দীনেশচন্দ্র সেন৷

Comments

  1. খুব জরুরি একটি লেখাা।

    ReplyDelete
  2. Replies
    1. অশেষ ধন্যবাদ৷ শুভকামনা নিরন্তর৷

      Delete
  3. তথ্য বহুল লেখা ....খুবই ভালো লাগলো

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

কবিগান বঙ্গের শ্রেষ্ঠ লোকগান..

      কবিগানে লোকশিক্ষার পাশাপাশি আছে বিনোদন  গণেশ ভট্টাচার্যঃ  ২১ মে, ২০২৫: বাঁকুড়া—  কবিগান বঙ্গের সর্বশ্রেষ্ঠ লোকশিক্ষামূলক লোকগান, কারণ এই গানের মত এত শিক্ষা, জ্ঞান ও সমাজ সচেতনতার বার্তা আর অন্য কোথাও পাওয়া যায় না৷ মজার ছলে সমাজকে লোকশিক্ষা দেওয়াতে এই লোকগানের আর জুড়ি মেলা ভার৷ অবশ্য সব কবিগানের দল মানেই যে মজা বা বিনোদন আছে তা কিন্তু নয়৷ কবিয়ালের শিক্ষা, পরিবেশনের দক্ষতা, বুৎপত্তি ও সর্বোপরি ঈশ্বরপ্রদত্ত প্রতিভার জোরে একজন কবিয়াল সমাজের সর্বস্তরে গ্রহণযোগ্য হয়৷  অনলস প্রচেষ্ঠা ও অধ্যবসায়ের দ্বারা কবিয়াল সমাজে জনপ্রিয় ও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়৷ বর্তমানে জনপ্রিয়তার শিখরে বিরাজমান কবিগানের দল "যামিনী রামকিঙ্কর কবিগান ট্রুপ" এর অনুষ্ঠানের  একটু ঝলক দেওয়া হল৷  কবিগান দীর্ঘজীবি হোক.. 

বুটিকার্ট ইউনিক মেলায় কবিগানের সম্মান

আইসিসিআর গ্যালারিতে কবিগানের সম্মান  কলকাতার রবীন্দ্রনাথ টেগোর সেন্টারে আইসিসিআর গ্যালারিতে Boutiqart.org এর পক্ষ থেকে কবিয়াল গণেশ ভট্টাচার্যকে বিশেষ সম্মান প্রদান করা হয়..  গণেশ ভট্টাচার্য:              এই বাংলায় যাঁরা নিরলস প্রচেষ্টা ও অধ্যবসায়ের দ্বারা মাটির কোলঘেঁসা লোককৃষ্টিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন ও নানা গঠনমূলক কর্মের মাধ্যমে আদি সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন তাঁদের এক ছাতার তলায় আনার মহতী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন বুটিকার্ট ডট অর্গ. নামক একটি সংস্থা৷ আন্তর্জাতিক মানের এই সংস্থাটির দীর্ঘদিনের স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটল কলকাতার রবীন্দ্রনাথ টেগোর সেন্টারে৷   Boutiqart.org এর পক্ষ থেকে কিউ টিভির কর্ণধার মাননীয়া সৃজা সুর ঘোষ সংবর্ধনা জ্ঞাপন করছেন কবিয়াল গণেশ ভট্টাচার্যকে..                                 গত ২৮, ২৯ ও ৩০ শে এপ্রিল এই তিনদিন ব্যাপী লোকশিল্পের সম্ভার বসেছিল কলকাতার ইণ্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনসের গ্যালারিতে৷ হো চি মিন সরণীতে অনুষ্ঠিত এই লোকশি...

মনসার জাতগান.. এক বিলুপ্তপ্রায় লোকগান

  দেবী মনসার জাতগান..  কবিয়াল গণেশ ভট্টাচার্য                                 কবিগানের মত মনসার জাতগানও বাংলার এক ঐতিহ্যপূর্ণ লোকগান৷ সাধারণতঃ আষাঢ়-শ্রাবণ-ভাদ্র-আশ্বিন মাসে এই গান বঙ্গের মনসা মন্দিরগুলিতে মাতৃৃৃৃৃৃৃৃৃসদনে গাওয়া হয়৷ জ্যৈষ্ঠ মাসে দশহরা থেকে শুরু করে আশ্বিন মাসের সংক্রান্তি অর্থাৎ ডাকসংক্রান্তি পর্যন্ত শনি ও মঙ্গলবার ধরে বিভিন্ন স্থানে নাগমাতার পূজা অনুষ্ঠিত হয়৷ গ্রামগঞ্জে তাই আজও দেবীর লীলাসম্বলিত জাতগান খুব জনপ্রিয়৷                              জাতগানের ভিডিও                কবিগানের সাথে এই জাতগানের কিয়দংশে সাদৃৃৃৃৃৃশ্য লক্ষ্য করা যায়৷ অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতকে কয়েকটি বিশেষ পর্যায় গেয়ে কবিগান শুরু করা হত৷ তৎকালীন কবিয়ালগণ প্রথমেই সখীসংবাদ পর্যায় গাইতেন৷ সখীসংবাদ ও দূতীসংবাদ কীর্তনের মাথুরলীলা সম্পর্কিত, যা মথুরাকেন্দ্রিক৷ মনসার জাতগানেও এই সখীসংবাদ ও দূতীসংবাদ পর্যা...