The origination of Bengali Kabigaan
কবিগানের আবির্ভাবকাল ও উৎপত্তি
কবিয়াল গণেশ ভট্টাচার্যঃ
সাহিত্য সৃষ্টির আগে
কবিগানের ভাব জাগে
আদিকবির মানস মোহনায়..
কবিগানের ভাব জাগে
আদিকবির মানস মোহনায়..
বঙ্গদেশের শ্রেষ্ঠ লোকগান কবিগান বাংলার লোকায়ত সাহিত্যের এক বিপুল সম্পদ যেটি বাঙালির মনের মণিকোঠায় আজও উদ্ভাসিত৷ কবিগানের উৎস ও উৎপত্তিকাল বিষয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ লক্ষ্য করা যায়৷ কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত বিরচিত “কবিজীবনী”, ডঃ প্রফুল্লচন্দ্র পালের “প্রাচীন কবিওয়ালার গান”, নিরঞ্জন চক্রবর্ত্তী রচিত “ঊনবিংশ শতাব্দীর কবিওয়ালা ও বাংলাসাহিত্য”, ডঃ দীনেশচন্দ্র সেনের “বঙ্গভাষা ও সাহিত্য” এবং “পূর্ববঙ্গের কবিয়াল ও কবিসংগীত”, ডঃ সুশীলকুমার দে রচিত “হিষ্ট্রি অফ বেঙ্গলি লিটারেচার ইন দ্য নাইনটিন্থ সেঞ্চুরি”, গোপালচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের “প্রাচীন কবিগান সংগ্রহ”, ডঃ সুকুমার সেনের “বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস”, ডঃ অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত “বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত” প্রভৃতি গ্রন্থে কবিগানের উৎপত্তির ইতিহাস বিধৃত আছে৷ কিন্তু উক্ত বিদগ্ধজনেরা স্ব স্ব যুক্তির মাধ্যমে কবিগানের আবির্ভাবকাল ও উৎপত্তির পটভূমিকা বিষয়ে বিভিন্ন স্বাধীন মত পোষণ করেছেন৷
কবিগানের ইতিহাস
প্রাচীন কবিসংগীতের উৎপত্তির ইতিহাস কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত কর্তৃক সম্পাদিত “সংবাদ প্রভাকর” পত্রিকায় বহুলাংশেই প্রকাশিত হয়েছিল৷ উক্ত পত্রিকার ১২৬১ সনের ১ লা অগ্রহায়ণ সংখ্যায় শ্রী গুপ্ত মহাশয় লিখেছেন— “১৪০ বা ১৫০ বর্ষ গত হইল, গোঁজলা গুঁই নামক এক ব্যক্তি পেশাদারি দল করিয়া ধনীদিগের গৃহে গাহনা করিতেন৷ লালু-নন্দলাল, রঘু ও রামজী এই তিনজন কবিওয়ালা উক্ত গোঁজলা গুঁইয়ের সঙ্গীত শিষ্য ছিলেন৷” গোঁজলা গুঁইয়ের আবির্ভাবকাল সম্বন্ধে গুপ্ত কবি মহাশয়ের উক্ত যুক্তি ডঃ প্রফুল্লচন্দ্র পাল মহাশয় বিশ্বাস করতে সম্পূর্ণভাবে অক্ষম ছিলেন৷ তিনি লেখেন— “প্রাচীনতম কবিয়াল গোঁজলা গুঁইয়ের আবির্ভাবকাল ১৪০ বা ১৫০ বৎসর পূর্বেকার ধরিলে তাঁহাকে সপ্তদশ শতাব্দীর কবিয়াল বলিয়া গণ্য করিতে হয়৷ ইহা একপ্রকার অসম্ভব, কারণ সপ্তদশ শতাব্দীতে কবিগানের কোনরূপ অস্তিত্বই ছিল না৷ উপরন্তু আমরা জানি যে রঘুনাথের শিষ্য রাসুর জন্মকাল ১৭৩৫ খ্রীঃ, নৃসিংহের ১৭৩৮ খ্রীঃ এবং লালু-নন্দলালের শিষ্য নিতাই বৈরাগীর জন্মকাল ১৭৫১ খ্রীস্টাব্দ৷ ইহা হইতে অনুমান করা যায় রঘু, লালু-নন্দলাল এই তিনজন গোঁজলা গুঁইয়ের শিষ্য অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত নিশ্চয়ই জীবিত ছিলেন৷ সুতরাং গোঁজলা গুঁই সপ্তদশ শতাব্দীর লোক- ইহা কেমন করিয়া হইতে পারে?” ডঃ সুকুমার সেন কবিগানের প্রাচীনতম নমুনার সন্ধান পেয়েছেন “করুণানিধানবিলাস” এ ধৃত খেউড় গানে৷ জয়নারায়ণ ঘোষালের উক্ত কাব্যগ্রন্থটি অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয় দশকে রচিত এবং তাঁর মতে কবিগানের প্রচলন এর পূর্ববর্তী সময়েও ছিল৷
কবিগানের উৎকর্ষকাল

কবিগানের চরম উৎকর্ষ ১৭৬০ থেকে ১৮৩০ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে ঘটেছিল বলে ডঃ সুশীলকুমার দে অভিমত দিয়েছেন৷ তবে তিনি ডঃ সেনের মতো কবিগানের কোন প্রাচীনতম নিদর্শনের উল্লেখ করেন নাই৷ তিনি তাঁর “History of Bengali Literature in the Nineteenth Century” গ্রন্থে লিখেছেন— “It is very difficult in the absence of materials to trace the origin of this peculiar form of literature. Most of the songs which have come down us belong to a date posterior to the middle of the 18th century.” ডঃ অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে— “কবিগান কত প্রাচীন তা নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু অষ্টাদশ শতাব্দীর পূর্বে যে কবিগানের চল ছিল তাতে কোন সন্দেহ নাই৷ সপ্তদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধেও কবিগান জনপ্রিয় ছিল এবং তারও পূর্বে যে কবিগানের উৎপত্তি হয়েছে ধরে নিতে হয়৷” অধ্যাপক গোপাল হালদার ডঃ সুশীলকুমার দের মতের স্বপক্ষে লিখলেন— “কবিওয়ালাদের প্রভাব প্রতিপত্তির কাল ছিল ১৭৬০ থেকে ১৮৩০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত, তার আগে ও পরেও কবিওয়ালারা ছিলেন তা বলাই বাহুল্য৷” যাইহোক, কবিগানের প্রাচীনত্ব নিয়ে যে মতপার্থক্য থাক না কেন অষ্টাদশ শতাব্দীর পূর্বে সপ্তদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকেই কবিগানের প্রচলন ছিল অনুমান করা চলে৷ তবে কোন অবস্থাতেই কবিগানকে সপ্তদশ শতাব্দীর বলা যাবে না৷
কবিগানের উৎপত্তিকাল বিষয়ে পণ্ডিত গবেষকগণ যে শুধু বিতণ্ডায় জড়িয়েছেন তা নয়, কবিগানের উৎস বিচারেও কবির আসরের ন্যায় স্বপক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি খাড়া করেছেন৷ ডঃ সুকুমার সেন “খেউড়” বা “খেঁউড়” কেই কবিগানের পূর্বরূপ বলে মনে করেন৷ উক্ত অমার্জিত ও বিকৃত রুচির ভাবভাষার গান অবরুদ্ধ মহিলামহলে বিশেষ প্রচলিত ছিল, যেটি কবিগানের পূর্বরূপ৷ ডঃ অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে নদীয়া-শান্তিপুরের “খেঁড়ুই” হল কবিগানের আদিরূপ৷ আদিরসাত্মক ও স্থূলরুচির উক্ত গানই কবিগানের উপসংহাররূপে স্বীকৃত হয়েছে৷ গঙ্গাচরণ বেদান্ত বিদ্যাসাগর ভট্টাচার্য মহাশয় “আখড়াই” সংগীতকে কবিগানের পূর্বরূপ বলে অভিহিত করেছেন৷ ডঃ দীনেশচন্দ্র সেন মনে করেন কবিগান আদিতে ছিল প্রাচীন যাত্রা অথবা জনপ্রিয় নাটকেরই অংশ— “The Kabi songs had originally constituted parts of old Yatra, a popular Plays.” ডঃ সুশীলকুমার দে এর প্রতিবাদ করেন৷ তিনি বলেন কবিগান ও যাত্রা উভয়ই আঙ্গিক ও বৈশিষ্টের দিক দিয়ে পৃথক এবং একই সময়ে যেহেতু যাত্রা ও কবিগান বিদ্যমান ছিল সেহেতু এক থেকে অন্যের উদ্ভব এ যুক্তি কখনই গ্রাহ্য হতে পারে না৷ ঝুমুর থেকে কবিগানের উৎপত্তি এ মতের প্রবক্তা ডঃ হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়৷ তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন মধ্যযুগে সংলাপধর্মী ও প্রশ্নোত্তরমূলক রচনা নৃত্যগীতের মাধ্যমে ঝুমুর গানে পরিবেশিত হত, যার সাথে কবিগানের বিষয়বস্তু, আঙ্গিকতা ও গায়কিরীতির যথেষ্ট গভীর মিল বিদ্যমান৷ গ্রাম থেকে শহরে কবিগান গিয়েছিল না শহর থেকে গ্রামে তাও পণ্ডিতসমাজে স্থিরীকৃত হয় নাই৷ আধুনিক গবেষকগণ মনে করেন নগর কলকাতার দূরে লোকায়ত সমাজ ও লৌকিক ঐতিহ্য থেকেই কবিগানের উদ্ভব ও বিকাশ হয়েছিল৷ গ্রামবাংলার ভাবভঙ্গী গানবাজনা মন ও আবেগ প্রভৃতির উপর ভিত্তি করে কবিগান সর্বপ্রথম গ্রামেই ভূমিষ্ঠ হয়েছিল এবং গোড়ার দিকে এ গান মূলতঃ লোকসাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল, আর ঝুমুর, যাত্রা ও পাঁচালীর সাথেই ছিল এর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তা৷ আবার অধিকাংশ পণ্ডিতগণ মনে করেন ইংরেজ কৃপাধন্য অর্থ প্রাচুর্যে মদমত্ত বাবুদের আমোদপ্রমোদের গানই কবিগানরূপে উদ্ভূত৷

কবিগানের পূর্বরূপ
যাইহোক, কবিগানের উৎসবিচারে পণ্ডিত গবেষকগণ নির্দিষ্ট ঐক্যমতে পৌঁছতে পারেন নাই৷ প্রচলিত কথায় বলে— “নানা মুনির নানা মত৷” এ যেন রসগোল্লার জি আই তকমা অর্জনার্থে বাংলা—উড়িষ্যার লড়াইয়ের মতো কবিগানের উৎস ও উৎপত্তির বিষয়ে দুই বঙ্গের বিদগ্ধ পণ্ডিতকুলের লড়াই৷ কিন্তু বাঙালি হিসেবে আমরা গর্ববোধ করি এবং মনেপ্রাণে আমাদের বিশ্বাস কবিগানের উৎপত্তি অবিভক্ত বাংলায়, আর এটি আমাদের নিজস্ব লোকায়ত সম্পদ৷

Comments
Post a Comment