Skip to main content

কবিগান ও কবিয়াল উপাধি..


কবিগান ও কবিয়াল উপাধি 


কবিয়াল গণেশ ভট্টাচার্য 


এই যে মোদের কবিগান
আদি হতে বিদ্যমান
বাংলার মান বাংলার প্রাণ
          সোনার বাংলায় কবি....
আমরা যত চারণদলে
গেয়ে বেড়াই কৌতুহলে
ফুটিয়ে তুলি ছন্দেতালে
            বঙ্গমাতার ছবি....


     

          উদ্ধৃত শব্দগুচ্ছ কোন কবিতার অংশবিশেষ নয়, এটি কবিগানের একটি পয়ার ছন্দ৷ কবিগান হল চাপান—উতোর আঙ্গিক সমৃদ্ধ ছন্দোবদ্ধ লোকগান৷ কী নেই এ গানে? সুর, তাল, লয়, ছন্দ, রস, অলঙ্কার, অনুপ্রাস, ব্যাখ্যা, দোঁহা, শ্লোক এবং শাস্ত্রপুরাণ, বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল, সমাজবিদ্যা এমনকি সদ্যঘটিত ঘটনা বিষয়ক প্রহেলিকাপূর্ণ রসদ বিদ্যমান এ কবিগানে৷ এত শিক্ষা আর সচেতনতা অন্যান্য সঙ্গীতে বিরল৷ কবিগান আট থেকে আশি আবালবৃদ্ধবণিতাকে চেতনা দান করে সামাজিক ঐক্য ও উন্নয়ন ঘটায়৷ কিন্তু হায়! অদ্যাবধি কবিগান সমাজে উপেক্ষিত৷ অবশিষ্ট সঙ্গীতের যেরূপ কদর সেথায় কবিগান যেন দুয়োরাণী৷

                        কবিগান কি?


             বঙ্গদেশের শ্রেষ্ঠ ঐতিহ্যপূর্ণ ও শিক্ষামূলক লোকগান হল কবিগান৷ কবির গানই কবিগান, আর যিনি ঢোলের তালে অঙ্গ দুলিয়ে ছড়া কেটে গানের মাধ্যমে পরিবেশন করেন তাকে বলা হয় "কবিয়াল" বা "কবিওয়ালা"৷ কবিগান বাদবিতণ্ডামূলক আর কবিয়ালগণ ছান্দসিক— তাঁরা ছন্দেবন্দে ফন্দিফিকিরে প্রতিদ্বন্দ্বী কবিওয়ালাকে বাক্যজালে ঘায়েল করেন৷ দুজন লড়াকু কবি কবিগানের আসরে একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে এক একজন এক এক পক্ষ অবলম্বন করেন৷ প্রথমজন যে পক্ষ নেবেন, তিনি যুক্তি দিয়ে স্বপক্ষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করবেন এবং অপরজনের গৃহীত বিষয়ের বিরুদ্ধে যুক্তি খাড়া করে বিপক্ষের বিষয়টিকে হেয় প্রতিপন্ন করবেন৷ দ্বিতীয়জনও একইভাবে নিজ যুক্তির মাধ্যমে স্বপক্ষের শ্রেষ্ঠতা আর বিপক্ষের নিকৃষ্টতা প্রমাণ করবেন৷
                এখন আলোচ্য বিষয় হল 'কবি' থেকে একজন কবি কিভাবে 'কবিয়াল' হয়ে উঠেন৷ ঐশ্বরিক শক্তির প্রভাবে একজন প্রকৃত কবিয়ালের স্বভাবে শিশুকাল হতেই কবিত্বভাব প্রস্ফুটিত ও পরিলক্ষিত হয়৷ চলনেবলনে আচার আচরণে প্রতিটি পদক্ষেপেই তার কবির ছন্দ থাকে৷ "কবি" শব্দের অর্থ হল জ্ঞানী৷ সুতরাং জ্ঞানাধারে প্রভূত জ্ঞান নিহিত না থাকলে কবি হওয়া যায় না৷ বেদ ও উপনিষদে "কবি" শব্দের অর্থ মন্ত্রস্রষ্টা, যিনি সত্যদ্রষ্টা৷ মহাকাব্যিক রচনাকালে চ্যবন মুনির পুত্র দস্যু রত্নাকর ব্রহ্মা ও দেবর্ষি নারদের সংস্পর্শে বাল্মিকী হয়ে রামাবতারের পূর্বেই রামায়ণ রচনা করেন এবং "আদিকবি" আখ্যায় সম্বোধিত হন৷ তাঁর উত্তরসূরী বঙ্গানুবাদক কবি কৃত্তিবাস ওঝা, জগদ্রামী রামায়ণ রচয়িতা পিতাপুত্র কবি জগদ্রাম রায় ও রামপ্রসাদ রায়, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন রচয়িতা কবি চণ্ডীদাস, গীতগোবিন্দম রচয়িতা কবি জয়দেব গোস্বামী, কবি তুলসীদাস, কবি কালিদাস, কবি জ্ঞানদাস, কবি সন্ধ্যাকর নন্দীও "কবি" আখ্যায় ভূষিত হয়েছিলেন৷ মঙ্গলকাব্যের যুগেও চণ্ডীমঙ্গলের রচয়িতা মুকুন্দরাম চক্রবর্তী "কবিকঙ্কন" ও কালিকামঙ্গলের রচয়িতা বলরাম "কবিশেখর" উপাধি পান৷ মনসামঙ্গলের কবি বিজয় গুপ্ত ও কবি কেতকাদাস ক্ষেমানন্দও "কবি" আখ্যা পান৷ এছাড়া কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে "বিশ্বকবি", কাজী নজরুল ইসলামকে "বিদ্রোহীকবি", সুকান্ত ভট্টাচার্য্যকে "কিশোরকবি" এবং জসীমউদ্দিনকে "পল্লীকবি" নামে অভিহিত করা হয়৷ 


                    কবিয়ালের উপাধি

         


                    অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে কবিয়ালগণ কবিগানের প্রারম্ভিককালে পদাবলী রচয়িতাগণের ন্যায় "কবি" আখ্যা পান৷ তৎকালীন কবি ছিল দ্বিজাতীয়— ১) পাঁচালী গানের কবি ও ২)দাঁড়াকবি৷ মঙ্গলকাব্য সাহিত্যের যুগের শেষভাগে পাঁচালী কবিদের আবির্ভাব ঘটেছিল যাঁরা পঞ্চাবলীর সুরে গান করতেন৷ পরবর্তীকালে এঁরা পঞ্চাবলী হতে পাঁচালী এবং ক্রমে পায়ে চালি কবিতে পরিবর্তিত হয়েছিলেন (পঞ্চাবলী>পাঁচালী>পায়ে চালি)৷ আর "দাঁড়া" শব্দের অর্থ হল বাঁধা পদ্ধতি৷ কবিগান নিত্যনতুন সৃষ্টির গান আর একজন প্রকৃত কবিয়াল সৃষ্টিধর্মী, সৃজনশীলতাই তাঁর সহজাত গুণ৷ কবিগানের আসরে সম্মুখসমরে তৎক্ষণাৎ গান বেঁধে সুর ও ছন্দে পরিবেশন করেন কবিওয়ালা, উক্ত বাঁধন পদ্ধতিই হল "দাঁড়া"৷ কবিগানের সূচনা পরবর্তীতে প্রতিটি কবিয়ালের আসরে গান বেঁধে দেওয়ার জন্য একজন সহকারী থাকতেন, এদের "বাঁধনদার" বলা হতো৷ এরা "দাঁড়াকবি" গায়কদের সাথে প্রতিটি আসরে পাশে বসে গান বেঁধে দিতেন৷ ডঃ সুকুমার সেন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের প্রথম খণ্ডে বলেছেন—"দাঁড়াইয়া গাওয়া হইত বলিয়াই "দাঁড়া" কবি নাম হইয়াছে— এরূপ উদ্ভট ধারণা অনেকেই পোষণ করেন৷ ইহারা ভুলিয়া যান যে পাঁচালী-তরজা-কবি ইত্যাদি সবই দাঁড়াইয়া গাওয়া হইত, বসিয়া কিংবা শুইয়া নয়৷" যাইহোক, উক্ত দাঁড়াকবিরা পরবর্তীকালে "কবিয়াল" উপাধি পান যেটি সংস্কৃত শব্দ "কবিপাল" হতে উদ্ভুত৷
              আপামর জনসাধারণের জন্য কবিগানের মাধ্যমে লোকশিক্ষা ও চেতনা দান করেন বলে একজন কবিয়ালকে "লোককবি" বলা হয়৷ তিনি "স্বভাবকবি" নামেও সর্বজনবিদিত, কারণ কবিত্বশক্তিই তাঁর জন্মজাত ও ঈশ্বরপ্রদত্ত৷ সুতরাং একজন প্রকৃত কবিয়ালই সমাজের শ্রেষ্ঠ অভিভাবক যিনি তাঁর মননশীলতায় সুর-লয়-তান-ছন্দ-অলঙ্কার-রসজ্ঞান ও বাগবৈদগ্ধ্যের দ্বারা সমাজকে সুস্থ রাখেন৷

Comments

Popular posts from this blog

কবিগান বঙ্গের শ্রেষ্ঠ লোকগান..

      কবিগানে লোকশিক্ষার পাশাপাশি আছে বিনোদন  গণেশ ভট্টাচার্যঃ  ২১ মে, ২০২৫: বাঁকুড়া—  কবিগান বঙ্গের সর্বশ্রেষ্ঠ লোকশিক্ষামূলক লোকগান, কারণ এই গানের মত এত শিক্ষা, জ্ঞান ও সমাজ সচেতনতার বার্তা আর অন্য কোথাও পাওয়া যায় না৷ মজার ছলে সমাজকে লোকশিক্ষা দেওয়াতে এই লোকগানের আর জুড়ি মেলা ভার৷ অবশ্য সব কবিগানের দল মানেই যে মজা বা বিনোদন আছে তা কিন্তু নয়৷ কবিয়ালের শিক্ষা, পরিবেশনের দক্ষতা, বুৎপত্তি ও সর্বোপরি ঈশ্বরপ্রদত্ত প্রতিভার জোরে একজন কবিয়াল সমাজের সর্বস্তরে গ্রহণযোগ্য হয়৷  অনলস প্রচেষ্ঠা ও অধ্যবসায়ের দ্বারা কবিয়াল সমাজে জনপ্রিয় ও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়৷ বর্তমানে জনপ্রিয়তার শিখরে বিরাজমান কবিগানের দল "যামিনী রামকিঙ্কর কবিগান ট্রুপ" এর অনুষ্ঠানের  একটু ঝলক দেওয়া হল৷  কবিগান দীর্ঘজীবি হোক.. 

বুটিকার্ট ইউনিক মেলায় কবিগানের সম্মান

আইসিসিআর গ্যালারিতে কবিগানের সম্মান  কলকাতার রবীন্দ্রনাথ টেগোর সেন্টারে আইসিসিআর গ্যালারিতে Boutiqart.org এর পক্ষ থেকে কবিয়াল গণেশ ভট্টাচার্যকে বিশেষ সম্মান প্রদান করা হয়..  গণেশ ভট্টাচার্য:              এই বাংলায় যাঁরা নিরলস প্রচেষ্টা ও অধ্যবসায়ের দ্বারা মাটির কোলঘেঁসা লোককৃষ্টিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন ও নানা গঠনমূলক কর্মের মাধ্যমে আদি সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন তাঁদের এক ছাতার তলায় আনার মহতী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন বুটিকার্ট ডট অর্গ. নামক একটি সংস্থা৷ আন্তর্জাতিক মানের এই সংস্থাটির দীর্ঘদিনের স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটল কলকাতার রবীন্দ্রনাথ টেগোর সেন্টারে৷   Boutiqart.org এর পক্ষ থেকে কিউ টিভির কর্ণধার মাননীয়া সৃজা সুর ঘোষ সংবর্ধনা জ্ঞাপন করছেন কবিয়াল গণেশ ভট্টাচার্যকে..                                 গত ২৮, ২৯ ও ৩০ শে এপ্রিল এই তিনদিন ব্যাপী লোকশিল্পের সম্ভার বসেছিল কলকাতার ইণ্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনসের গ্যালারিতে৷ হো চি মিন সরণীতে অনুষ্ঠিত এই লোকশি...

মনসার জাতগান.. এক বিলুপ্তপ্রায় লোকগান

  দেবী মনসার জাতগান..  কবিয়াল গণেশ ভট্টাচার্য                                 কবিগানের মত মনসার জাতগানও বাংলার এক ঐতিহ্যপূর্ণ লোকগান৷ সাধারণতঃ আষাঢ়-শ্রাবণ-ভাদ্র-আশ্বিন মাসে এই গান বঙ্গের মনসা মন্দিরগুলিতে মাতৃৃৃৃৃৃৃৃৃসদনে গাওয়া হয়৷ জ্যৈষ্ঠ মাসে দশহরা থেকে শুরু করে আশ্বিন মাসের সংক্রান্তি অর্থাৎ ডাকসংক্রান্তি পর্যন্ত শনি ও মঙ্গলবার ধরে বিভিন্ন স্থানে নাগমাতার পূজা অনুষ্ঠিত হয়৷ গ্রামগঞ্জে তাই আজও দেবীর লীলাসম্বলিত জাতগান খুব জনপ্রিয়৷                              জাতগানের ভিডিও                কবিগানের সাথে এই জাতগানের কিয়দংশে সাদৃৃৃৃৃৃশ্য লক্ষ্য করা যায়৷ অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতকে কয়েকটি বিশেষ পর্যায় গেয়ে কবিগান শুরু করা হত৷ তৎকালীন কবিয়ালগণ প্রথমেই সখীসংবাদ পর্যায় গাইতেন৷ সখীসংবাদ ও দূতীসংবাদ কীর্তনের মাথুরলীলা সম্পর্কিত, যা মথুরাকেন্দ্রিক৷ মনসার জাতগানেও এই সখীসংবাদ ও দূতীসংবাদ পর্যা...