Skip to main content

কবিগান.... তরজা ও ঝুমুর

Similarities and dissimilarities between Kabigaan and Tarjagaan..                                     

তরজা ও ঝুমুর সঙ্গীত বাংলার কবিগানে বৈচিত্রের স্বাদ আনে..  


কবিয়াল গণেশ ভট্টাচার্য 

"এই পর্যন্ত হলাম ক্ষান্ত রাধাকান্ত স্মরি..
প্রেমানন্দে ভক্তবৃন্দে বলুন হরি হরি৷৷"


                 কবিগান ও তরজাগানের সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যের তুলনায় উপরোক্ত পঙক্তিদুটি সাদৃশ্যের এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ৷ সম্মুখসমরে বাদানুবাদে লিপ্ত একজন পাল্লাদার তাঁর আসর সমাপনের ঠিক পূর্বেই উদ্ধৃত চরণ সাধারণতঃ দ্বিপদী পয়ার ছন্দে প্রতি আসরেই পরিবেশন করেন৷ শুধুমাত্র কবিয়াল বা তরজাগায়ক নয়, একজন কীর্তনীয়া, রামায়ণ ও পাঁচালীগায়ক, স্তাবক, ছড়াকার এমনকি পুরাণকারও উপর্যুক্ত ছত্র আসর অথবা স্তবক শেষে গেয়ে থাকেন৷ এক্ষেত্রে কবিগানের সহিত তরজাগানের সংগতি লক্ষণীয়৷ 


             তরজার উৎপত্তি 


                 সুমিষ্ট ঢোলবাদ্যের সাথে সুর ও তালের সমন্বয়ে ছন্দোবদ্ধভাবে কাব্যরস পরিবেশন করাই হল কবিগান, আর এ গানের প্রধান বাদ্যযন্ত্র ঢোল৷ অনুরূপভাবে তরজাগানেও প্রধান বাদ্যযন্ত্র ঢোলের সাথে একজন তরজাগায়ক ছন্দাকারে চাপান-উতোরে লিপ্ত হন৷ অনেক পণ্ডিতগণ মনে করেন যে আমাদের দেশে প্রচলিত লোকআঙ্গিক "তরজা" মূলতঃ আরবী শব্দ এবং "তরজ" ও "তরজমা" হতে শব্দটি উদ্ভুত৷ আরবীতে "তরজমা" শব্দ অনুবাদ অর্থে প্রযুক্ত হয় এবং মূল "তরজ" শব্দের অর্থ রীতি বা নিয়ম৷ পণ্ডিতদিগের অন্তরে এই প্রত্যয় জন্মে যে কবিগান যেহেতু নিয়মমাফিক ও পর্যায়ভুক্ত , তরজাগানও সমরূপ রীতিসম্বলিত৷ কারণ তরজা হল কবিগানের সংক্ষিপ্তরূপ ও পঞ্চাঙ্গের একাঙ্গ৷ "তরজা" শব্দটির প্রকৃত অর্থ তর্জনগর্জনপূর্বক বাদবিতণ্ডা এবং অনেকক্ষেত্রে চরমাবস্থায়  বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ ও মধ্যমার মধ্যবর্তী তর্জনী অঙ্গুলীটিও লম্বভাবে প্রতিপক্ষের উপর প্রদর্শিত হয়৷ সুতরাং তরজার সাথে তর্জনী ও তর্জনগর্জনের সংসর্গ স্পষ্ট প্রতীয়মান৷ সংগীতের ক্ষেত্রে "তরজা" শব্দের প্রয়োগ এখনও প্রশ্নোত্তরে হেঁয়ালি বা প্রহেলিকা অর্থে, তর্কচ্ছলে শ্লেষ এমন অর্থও হয়৷ কারণ প্রাচীন বাংলায় চড়ক ও ধর্মঠাকুরের উৎসবে যে তরজা  ও তর্জনগর্জনরূপ প্রমোদানুশীলন চলত তা শ্লেষ ও রসগানেই সীমাবদ্ধ ছিল৷ আজও এদেশে চড়ক ও ধর্মঠাকুরের উৎসবে তরজার অনুশীলন হয়৷ তবে শুধুমাত্র উপরোক্ত দুটি উৎসবেই নয়, বাঙালীর বারো মাসের তের পার্বনেই বর্তমানে কবিগান ও তরজাগানের আসর বসে৷ 


              রাজবাটীতে কবিগানের লড়াই 


                  অতি প্রাচীনকাল হতেই কবির লড়াই অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে৷ মহারাজ বিক্রমাদিত্যের রাজসভায় মহাকবি কালিদাস ও দণ্ডীর মধ্যে কবিত্বশক্তির পরীক্ষা চলত৷ এছাড়া মহারাজ লক্ষ্মণসেনের রাজসভায় কবি জয়দেব গোস্বামী, শরণদেব, উমাপতি ও গোবর্ধনাচার্যের মধ্যে পরস্পর লড়াই হত এবং মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের রাজসভায় কবিরঞ্জন রামপ্রসাদ সেন ও আজু গোঁসাইয়ের বাগযুদ্ধ কবি বা তরজার লড়াইকে স্মরণ করায়৷ ডঃ প্রফুল্লচন্দ্র পাল তাঁর "প্রাচীন কবিওয়ালার গান" গ্রন্থে বলেছেন— "তরজার পূর্বরূপ ছিল প্রকৃতপক্ষে বাকোবাক্য৷ বাকোবাক্য বলিতে বাগযুদ্ধ বুঝায়৷ কবিতে কবিতে কিংবা পণ্ডিতে পণ্ডিতে সেকালে রাজসভায় অথবা পঞ্চজনের উপস্থিতিতে চাপান ও উতোররূপে বাগযুদ্ধ চলিত৷ এই বাগযুদ্ধে প্রচুর শ্লেষ থাকিত৷" 


                      মিল ও গরমিল 


                    যাইহোক, কবিগান ও তরজাগানের মধ্যে সাদৃশ্য বেশী থাকলেও কবিগান ও তরজাগান কিন্তু এক নয়৷ ডঃ সুকুমার সেন "বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস" গ্রন্থে বলেছেন— "ঊনবিংশ শতাব্দের মধ্যভাগে কবিগান তরজা লড়াইয়ে পরিণত হয়েছিল৷" ডঃ সেনের এই পরিণত হওয়ার মন্তব্যেই পরিস্কার যে কবিগানের জন্ম তরজার পূর্বে এবং আঙ্গিকের কিছু সামঞ্জস্য থাকলেও দুটিই ভিন্নরীতির গান৷ ডঃ অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর "বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত" গ্রন্থে তরজাকে কবিগান ও পাঁচালী গানের সংমিশ্রনে উদ্ভুত লোকরঞ্জনকারী নতুন রীতির গান হিসাবে চিহ্নিত করেছেন৷ সুতরাং গবেষকগণের কথাতেই স্পষ্ট যে প্রাচীনত্বের দিক থেকে কবিগান তরজাগানের চেয়ে এগিয়ে৷ কবিগানের মত তরজাগানেও দুটি পক্ষ থাকে এবং উভয় পক্ষেই একজন করে মূলগায়ক, একজন করে ঢোলবাদক আর দু-তিন জন দোহার থাকেন যাঁরা মূলগায়ককে সাহায্য করেন ও বাদ্যযন্ত্র বাজান৷ বাদ্যযন্ত্রের সামান্য ফারাক পরিলক্ষিত হয়৷ কবিগানে বর্তমানে ঢোলের পাশে কাঁসির স্থান নিয়েছে জুড়ি ও করতাল, কিন্তু তরজাগানে এখনও ঢোলের সাথে কাঁসির ব্যবহার দেখা যায়৷ উভয় গানে চাপান-উতোর রীতি থাকলেও কবিগানে বিষয়বস্তুর ব্যাপকতা অনেক বেশী৷ তরজাগানে সাধারণতঃ রামায়ণ-মহাভারত ও নানা ধর্মগ্রন্থ হতে ছন্দাকারে প্রশ্নোত্তর করা হয়৷ কিন্তু কবিগানে প্রয়োজনে গদ্য সংলাপে বিষয়ের ব্যাখ্যা ও বিশদ আলোচনা করা হয়৷ কবিগানের শেষ পর্যায়ে দুই কবিয়াল আসরে একসাথে দণ্ডায়মান হয় এবং একটি নতুন বিষয়ে সরাসরি প্রশ্নোত্তর পর্ব চলে যাকে "মিলনগীতি" বা "বোলকাটাকাটি" বলে৷ যদিও "বোলকাটাকাটি" পর্যায়টি সর্বত্র প্রচলিত নয় এবং তরজাগানে এমন কোন পর্ব দেখা যায় না৷ তবে কবিগান ও তরজাগানের গায়কীরীতির অনেকাংশে মিল আছে বলেই অনেক কবিয়ালকে তরজাগান গাইতে দেখা যায়৷ 




           

                  কবিগান ও ঝুমুর


                  ডঃ হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় মনে করেন ঝুমুরগান হতেই কবিগানের উৎপত্তি হয়েছে৷ তবে একথা সত্য যে প্রাচীনত্বের দিক থেকে কবিগানের চেয়ে ঝুমুরগান এগিয়ে এবং দুটি গানই ভিন্নরীতির গায়কীধারায় পরিণত হয়েছে৷ কবিগান ও ঝুমুরগান- উভয়েরই প্রশ্নোত্তর রীতি আছে ৷ তবে ঝুমুরগানে কোন গদ্য সংলাপ থাকে না, পুরো প্রশ্নোত্তর পালাটি চলে নৃত্যগীতের মাধ্যমে৷ আর কবিগানে যুক্তিজাল বুনতে গদ্য সংলাপের প্রাধান্য থাকে৷ সংগতি ও অসংগতি যাই থাক, উভয় গানই প্রশ্নোত্তরমূলক ও বাংলার ঐতিহ্যপূর্ণ লোকসম্পদ৷


Comments

Popular posts from this blog

কবিগান বঙ্গের শ্রেষ্ঠ লোকগান..

      কবিগানে লোকশিক্ষার পাশাপাশি আছে বিনোদন  গণেশ ভট্টাচার্যঃ  ২১ মে, ২০২৫: বাঁকুড়া—  কবিগান বঙ্গের সর্বশ্রেষ্ঠ লোকশিক্ষামূলক লোকগান, কারণ এই গানের মত এত শিক্ষা, জ্ঞান ও সমাজ সচেতনতার বার্তা আর অন্য কোথাও পাওয়া যায় না৷ মজার ছলে সমাজকে লোকশিক্ষা দেওয়াতে এই লোকগানের আর জুড়ি মেলা ভার৷ অবশ্য সব কবিগানের দল মানেই যে মজা বা বিনোদন আছে তা কিন্তু নয়৷ কবিয়ালের শিক্ষা, পরিবেশনের দক্ষতা, বুৎপত্তি ও সর্বোপরি ঈশ্বরপ্রদত্ত প্রতিভার জোরে একজন কবিয়াল সমাজের সর্বস্তরে গ্রহণযোগ্য হয়৷  অনলস প্রচেষ্ঠা ও অধ্যবসায়ের দ্বারা কবিয়াল সমাজে জনপ্রিয় ও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়৷ বর্তমানে জনপ্রিয়তার শিখরে বিরাজমান কবিগানের দল "যামিনী রামকিঙ্কর কবিগান ট্রুপ" এর অনুষ্ঠানের  একটু ঝলক দেওয়া হল৷  কবিগান দীর্ঘজীবি হোক.. 

বুটিকার্ট ইউনিক মেলায় কবিগানের সম্মান

আইসিসিআর গ্যালারিতে কবিগানের সম্মান  কলকাতার রবীন্দ্রনাথ টেগোর সেন্টারে আইসিসিআর গ্যালারিতে Boutiqart.org এর পক্ষ থেকে কবিয়াল গণেশ ভট্টাচার্যকে বিশেষ সম্মান প্রদান করা হয়..  গণেশ ভট্টাচার্য:              এই বাংলায় যাঁরা নিরলস প্রচেষ্টা ও অধ্যবসায়ের দ্বারা মাটির কোলঘেঁসা লোককৃষ্টিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন ও নানা গঠনমূলক কর্মের মাধ্যমে আদি সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন তাঁদের এক ছাতার তলায় আনার মহতী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন বুটিকার্ট ডট অর্গ. নামক একটি সংস্থা৷ আন্তর্জাতিক মানের এই সংস্থাটির দীর্ঘদিনের স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটল কলকাতার রবীন্দ্রনাথ টেগোর সেন্টারে৷   Boutiqart.org এর পক্ষ থেকে কিউ টিভির কর্ণধার মাননীয়া সৃজা সুর ঘোষ সংবর্ধনা জ্ঞাপন করছেন কবিয়াল গণেশ ভট্টাচার্যকে..                                 গত ২৮, ২৯ ও ৩০ শে এপ্রিল এই তিনদিন ব্যাপী লোকশিল্পের সম্ভার বসেছিল কলকাতার ইণ্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনসের গ্যালারিতে৷ হো চি মিন সরণীতে অনুষ্ঠিত এই লোকশি...

মনসার জাতগান.. এক বিলুপ্তপ্রায় লোকগান

  দেবী মনসার জাতগান..  কবিয়াল গণেশ ভট্টাচার্য                                 কবিগানের মত মনসার জাতগানও বাংলার এক ঐতিহ্যপূর্ণ লোকগান৷ সাধারণতঃ আষাঢ়-শ্রাবণ-ভাদ্র-আশ্বিন মাসে এই গান বঙ্গের মনসা মন্দিরগুলিতে মাতৃৃৃৃৃৃৃৃৃসদনে গাওয়া হয়৷ জ্যৈষ্ঠ মাসে দশহরা থেকে শুরু করে আশ্বিন মাসের সংক্রান্তি অর্থাৎ ডাকসংক্রান্তি পর্যন্ত শনি ও মঙ্গলবার ধরে বিভিন্ন স্থানে নাগমাতার পূজা অনুষ্ঠিত হয়৷ গ্রামগঞ্জে তাই আজও দেবীর লীলাসম্বলিত জাতগান খুব জনপ্রিয়৷                              জাতগানের ভিডিও                কবিগানের সাথে এই জাতগানের কিয়দংশে সাদৃৃৃৃৃৃশ্য লক্ষ্য করা যায়৷ অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতকে কয়েকটি বিশেষ পর্যায় গেয়ে কবিগান শুরু করা হত৷ তৎকালীন কবিয়ালগণ প্রথমেই সখীসংবাদ পর্যায় গাইতেন৷ সখীসংবাদ ও দূতীসংবাদ কীর্তনের মাথুরলীলা সম্পর্কিত, যা মথুরাকেন্দ্রিক৷ মনসার জাতগানেও এই সখীসংবাদ ও দূতীসংবাদ পর্যা...