Skip to main content

রাজ্য বিজ্ঞান মেলায় কবিগানের প্রশংসা

কবিগানের প্রতি খুদে বিজ্ঞানীদের উন্মাদনা..



           মহান বাঙালি বিজ্ঞানী আচার্য্য জগদীশ চন্দ্র বসু
                      
গণেশ ভট্টাচার্যঃ ২৯ নভেম্বর, ২০২১
                    
                  সালটা ২০০৮, পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ থেকে আমার কাছে ডাক এল রাজ্য বিজ্ঞান মেলায় বিজ্ঞানভিত্তিক কবিগান গাইতে হবে৷ মহান বাঙালি বিজ্ঞানী আচার্য্য জগদীশচন্দ্র বসুর সার্ধশতজন্মবার্ষিকীতে কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে রাজ্য বিজ্ঞান মেলার আয়োজন করা হয়েছে৷ পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত জেলা থেকে বাছাই করা স্কুলপড়ুয়া খুদে বিজ্ঞানীরা তাদের অভিনব আবিস্কার এই মেলায় প্রদর্শন করবেন এবং বিজ্ঞানের অগ্রগতির জন্য প্রত্যেকের হৃদয়ে উদ্ভাসিত বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা মেলার কর্মশালায় ব্যক্ত করবেন৷ আমরাও আনন্দিত হলাম এ কথা ভেবে যদি কর্মকর্তাদের কাছে বিজ্ঞানমনস্কতার কিছু নতুন কথা শোনাতে পারি খুব ভাল লাগবে৷

                 যাইহোক, মহান বাঙালি বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর জন্মদিনে অর্থাৎ ৩০ নভেম্বর আমি আমার কবিগানের দল “যামিনী রামকিঙ্কর কবিগান ট্রুপ” নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম কলকাতার উদ্দেশ্যে৷ দুপুর বারোটা নাগাদ যুবভারতী স্টেডিয়ামে পৌঁছলাম এবং স্নান সেরে মধ্যাহ্নভোজন করলাম৷ স্টেডিয়ামের গেস্ট হাউসে অর্থাৎ ভিভিআইপি অতিথিশালায় আমাদের বিশ্রামের ব্যবস্থা করা হল৷ ক্লান্তিঘুম থেকে উঠে সন্ধ্যেবেলায় টিফিন করে ধুতিপাঞ্জাবী পরে গানের জন্য প্রস্তুত হলাম৷

                সাংস্কৃতিক মঞ্চের চেয়ারে বসে বিজ্ঞান সচেতনতার বিভিন্ন অনুষ্ঠান দেখলাম ও জ্ঞানলাভ করলাম৷ অবশেষে আমরা কবিগান পরিবেশনার জন্য ডাক পেলাম রাত্রি আটটায়৷ মঞ্চে তখন পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ হতে মাননীয় সৌরভ চক্রবর্তী ও যুবকল্যান বিভাগ হতে মাননীয় সৌমিত্র লাহিড়ী আমাদের যামিনী রামকিঙ্কর কবিগান ট্রুপকে আহ্বান জানালেন কবিগান পরিবেশনার জন্য৷ সংক্ষিপ্ত গৌরচন্দ্রিকা সেরে আমরাও বিজ্ঞান চেতনার সাগরে ডুব দিলাম৷



কবিগানের মাধ্যমে বিজ্ঞান সচেতনতার এক বিশেষ প্রতিবেদন ‘সংবাদ’ খবরের কাগজে..



               তখন বামফ্রন্টের আমল, মাননীয় সুভাষ চক্রবর্তী রাজ্যের ক্রীড়া ও পরিবহণ মন্ত্রী৷ তিনি তিরিশ মিনিট ধরে খুব মনোযোগ সহকারে আমাদের কবিগান শুনলেন এবং উচ্চ প্রশংসা করলেন৷ হঠাৎ ঘোষিত হল ডান্স বাংলা ডান্সের শ্যুটিং শেষে মিঠুন চক্রবর্তী আসছেন ক্ষুদে বিজ্ঞানীদের সাথে আলাপ করতে৷ আমি তখন বিজ্ঞানের ভূমিকায় যুক্তিতর্কের এক চরম মুহূর্তে৷ সকলেই নিশ্চুপ হয়ে খুব মন দিয়ে কবিগান শুনছেন৷ অকস্মাৎ সুপারস্টার হাজির হলেন৷ মাননীয় ক্রীড়ামন্ত্রী মিঠুনবাবুকে এসকর্ট করে মঞ্চে নিয়ে এলেন৷ উনি সুভাষবাবুর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে মঞ্চে দাঁড়ালেন৷ আমরা তিনজন তখন মঞ্চে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে— বাঁদিকে সুভাষ চক্রবর্তী, মধ্যিখানে মিঠুন চক্রবর্তী আর ডানদিকে আমি গণেশ ভট্টাচার্য৷ এত বড় একজন সুপারস্টারকে সামনে পেয়ে সকলের ছবি তোলার হুড়োহুড়ি পড়ে গেল৷ কিন্তু দুঃখের বিষয়, তখন আমার কাছে ভাল মোবাইল না থাকার জন্য ছবিটা আপনাদের দেখাতে পারলাম না৷ যাইহোক, সকলে সুভাষবাবুকে অনুরোধ করলেন কবিগানের একটা পয়ার ছন্দ গেয়ে শোনানোর জন্য৷ উনি বাংলাদেশের প্রখ্যাত কবিয়াল বিজয় সরকারের এক চরণ গান গেয়ে শোনালেন৷ প্রায় কুড়ি মিনিট থাকার পর মিঠুন চক্রবর্তী বিদায় নিলেন ও সাথে সাথেই সুভাষ চক্রবর্তীও প্রস্থান করলেন৷ আর এদিকে কবিগানের অনুষ্ঠানও লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল৷ খুদে বিজ্ঞানী ও রাজ্য বিজ্ঞান মেলার উদ্যোক্তাদের সাথে আমরাও তৎক্ষণাৎ পোলাও ও খাঁসি মাংস দিয়ে নৈশাহারে প্রবৃত্ত হলাম৷ ভোজনকালীন একে একে সকলেই আমার ও কবিগান টিমের বাকি সদস্যদের কাছে এসে কবিগানের প্রশংসাপূর্বক খুব দুঃখপ্রকাশ করতে লাগলেন— “এত সুন্দর একটা শিক্ষামূলক মজার অনুষ্ঠান হচ্ছিল, এত বড় স্টার এসে সব লণ্ডভণ্ড করে দিলেন৷” সকলকে আমি শুধুমাত্র একটা কথা বলেই সান্ত্বনা দিলাম— “মেগাস্টার এলে ডিজাস্টার তো হবেই৷” 



Comments

Popular posts from this blog

কবিগান বঙ্গের শ্রেষ্ঠ লোকগান..

      কবিগানে লোকশিক্ষার পাশাপাশি আছে বিনোদন  গণেশ ভট্টাচার্যঃ  ২১ মে, ২০২৫: বাঁকুড়া—  কবিগান বঙ্গের সর্বশ্রেষ্ঠ লোকশিক্ষামূলক লোকগান, কারণ এই গানের মত এত শিক্ষা, জ্ঞান ও সমাজ সচেতনতার বার্তা আর অন্য কোথাও পাওয়া যায় না৷ মজার ছলে সমাজকে লোকশিক্ষা দেওয়াতে এই লোকগানের আর জুড়ি মেলা ভার৷ অবশ্য সব কবিগানের দল মানেই যে মজা বা বিনোদন আছে তা কিন্তু নয়৷ কবিয়ালের শিক্ষা, পরিবেশনের দক্ষতা, বুৎপত্তি ও সর্বোপরি ঈশ্বরপ্রদত্ত প্রতিভার জোরে একজন কবিয়াল সমাজের সর্বস্তরে গ্রহণযোগ্য হয়৷  অনলস প্রচেষ্ঠা ও অধ্যবসায়ের দ্বারা কবিয়াল সমাজে জনপ্রিয় ও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়৷ বর্তমানে জনপ্রিয়তার শিখরে বিরাজমান কবিগানের দল "যামিনী রামকিঙ্কর কবিগান ট্রুপ" এর অনুষ্ঠানের  একটু ঝলক দেওয়া হল৷  কবিগান দীর্ঘজীবি হোক.. 

বুটিকার্ট ইউনিক মেলায় কবিগানের সম্মান

আইসিসিআর গ্যালারিতে কবিগানের সম্মান  কলকাতার রবীন্দ্রনাথ টেগোর সেন্টারে আইসিসিআর গ্যালারিতে Boutiqart.org এর পক্ষ থেকে কবিয়াল গণেশ ভট্টাচার্যকে বিশেষ সম্মান প্রদান করা হয়..  গণেশ ভট্টাচার্য:              এই বাংলায় যাঁরা নিরলস প্রচেষ্টা ও অধ্যবসায়ের দ্বারা মাটির কোলঘেঁসা লোককৃষ্টিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন ও নানা গঠনমূলক কর্মের মাধ্যমে আদি সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন তাঁদের এক ছাতার তলায় আনার মহতী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন বুটিকার্ট ডট অর্গ. নামক একটি সংস্থা৷ আন্তর্জাতিক মানের এই সংস্থাটির দীর্ঘদিনের স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটল কলকাতার রবীন্দ্রনাথ টেগোর সেন্টারে৷   Boutiqart.org এর পক্ষ থেকে কিউ টিভির কর্ণধার মাননীয়া সৃজা সুর ঘোষ সংবর্ধনা জ্ঞাপন করছেন কবিয়াল গণেশ ভট্টাচার্যকে..                                 গত ২৮, ২৯ ও ৩০ শে এপ্রিল এই তিনদিন ব্যাপী লোকশিল্পের সম্ভার বসেছিল কলকাতার ইণ্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনসের গ্যালারিতে৷ হো চি মিন সরণীতে অনুষ্ঠিত এই লোকশি...

মনসার জাতগান.. এক বিলুপ্তপ্রায় লোকগান

  দেবী মনসার জাতগান..  কবিয়াল গণেশ ভট্টাচার্য                                 কবিগানের মত মনসার জাতগানও বাংলার এক ঐতিহ্যপূর্ণ লোকগান৷ সাধারণতঃ আষাঢ়-শ্রাবণ-ভাদ্র-আশ্বিন মাসে এই গান বঙ্গের মনসা মন্দিরগুলিতে মাতৃৃৃৃৃৃৃৃৃসদনে গাওয়া হয়৷ জ্যৈষ্ঠ মাসে দশহরা থেকে শুরু করে আশ্বিন মাসের সংক্রান্তি অর্থাৎ ডাকসংক্রান্তি পর্যন্ত শনি ও মঙ্গলবার ধরে বিভিন্ন স্থানে নাগমাতার পূজা অনুষ্ঠিত হয়৷ গ্রামগঞ্জে তাই আজও দেবীর লীলাসম্বলিত জাতগান খুব জনপ্রিয়৷                              জাতগানের ভিডিও                কবিগানের সাথে এই জাতগানের কিয়দংশে সাদৃৃৃৃৃৃশ্য লক্ষ্য করা যায়৷ অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতকে কয়েকটি বিশেষ পর্যায় গেয়ে কবিগান শুরু করা হত৷ তৎকালীন কবিয়ালগণ প্রথমেই সখীসংবাদ পর্যায় গাইতেন৷ সখীসংবাদ ও দূতীসংবাদ কীর্তনের মাথুরলীলা সম্পর্কিত, যা মথুরাকেন্দ্রিক৷ মনসার জাতগানেও এই সখীসংবাদ ও দূতীসংবাদ পর্যা...