কোভিডের জেরে বন্ধ কবিগানের লড়াই..
আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রতিবেদন..
গণেশ ভট্টাচার্য-
বিশ্বজুড়ে কোভিডের তাণ্ডব, অতিমারির জেরে কোটি কোটি মানুষ এখন কর্মহীন৷ খেটেখাওয়া মানুষজন অর্থাৎ যারা দিন আনে দিন খায়, বিশেষতঃ শ্রমিক-মজুরগণ সবচেয়ে বেশি আতান্তরে পড়েছেন৷ তবে শিল্পীগণের অবস্থা আরও সঙিন কারণ এদের কোন মাসমাইনের ব্যবস্থা নেই৷ কবিগান, কীর্তন, বাউল আদি মাটিঘেঁসা শিল্পীরা যাদের অনুষ্ঠান পরিবেশন না করলে চলে না তাদের পক্ষে সংসার চালানোই এখন দুরূহ ব্যাপার৷ এসবের মূলে কিন্তু এক অজানা ভাইরাস— যার নাম কোভিড৷ আবার এই অতিমারির সুযোগে সুযোগসন্ধানী এক শ্রেণীর মানুষ মুনাফা লুটতেই ব্যস্ত৷ এ প্রসঙ্গে মহাভারতের একটা ঘটনা স্মর্তব্য৷ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৌরব নিপাতনের পর একটা প্রবচন চালু হয়েছিল—"কারও পৌষমাস আর কারও সর্বনাশ৷" বর্তমান মহামারীর আবহেও শিল্পীগণের সর্বনাশই চলছে৷
কবিগান হল সবচেয়ে ঐতিহ্যপূর্ণ হাস্যরসাত্মক লোকগান৷ পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের অনেক ঐতিহ্যবাহী আসরে দীর্ঘ পরম্পরা অনুযায়ী একশত-দেড়শত বছর ধরে শুধুমাত্র কবিগানের লড়াই অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে৷ করোনা অতিমারির কারণে সেই বৈচিত্রপূর্ণ পরম্পরায় ছেদ পড়ল৷ কৌলিন্যানুযায়ী এমনও অনেক আসর আছে যেখানে দেবসমীপে অন্ততঃ একবার কবিগানের ঢোল বাজাতেই হবে৷ আমি আমার "যামিনী রামকিঙ্কর কবিগান ট্রুপ" নিয়ে এরকম অনেক আসরে কবিগান পরিবেশন করে থাকি৷ কিন্তু হায়, কোভিড বিষে পূর্ণ বিশ ও একুশ সালে প্রাণ বাঁচানোই যে বড় চ্যালেঞ্জের বিষয়৷ বেঁচে থাকলে অনুষ্ঠান আবার হবে৷ তবে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে আমাদের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত মাইকম্যান, ডেকোরেটার্সম্যান ও রাঁধুনীদের কথা ভেবে৷ আয়োজকরা কবিগান বা অন্যান্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করলে শিল্পীদের পাশাপাশি এরা সকলেই পরিশ্রম ও বিনিয়োগের মাধ্যমে কিছু উপার্জন করে৷ কিন্তু এমতাবস্থায় সকলেই নিরুপায়৷ কুড়ি সালে ৫ চৈত্র হতে দশমাস বাড়িতে কাটিয়েছিলাম, আর একুশে ১৫ বৈশাখ হতে একটানা নিজ বাসভবনে অপেক্ষাতেই আছি৷ কেউ জানি না কবে যে আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসব৷

Comments
Post a Comment